উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
১৯৬০ সালের অপরাধী প্রবেশন অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় নয়-এমন অপরাধের ক্ষেত্রে যোগ্য পুরুষ অপরাধীরা প্রবেশনের সুযোগ পেতে পারেন। মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে নারী অপরাধীরাও এ সুযোগের আওতায় আসতে পারেন। অন্যদিকে, শিশু আইন, ২০১৩-এর বিধান অনুযায়ী, আইনের শর্ত সাপেক্ষে অপরাধের ধরন নির্বিশেষে শিশু অপরাধীদের প্রবেশনে রাখার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের কারাগারগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার বন্দি রয়েছেন, যেখানে ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৬ হাজার। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারেই প্রায় ৬ হাজার বন্দি রয়েছেন, যা কারাগারটির নির্ধারিত ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রবেশন কর্মকর্তা মনজুর মোরশেদ একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলেন, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় ৫২ শতাংশ ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর কিংবা সাজা ভোগ শেষে পুনরায় অপরাধ বা বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এ তথ্য অপরাধীদের কার্যকর পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তিনি বলেন, প্রবেশনপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশ শর্ত মেনে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেন বলে তার ধারণা। তবে কেউ শর্ত ভঙ্গ করলে তাকে মূল দণ্ড ভোগের জন্য কারাগারে পাঠানো হতে পারে। তবে জনবলের সংকট, পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তার অভাব ও সীমিত অর্থায়নের কারণে প্রবেশন ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ আহসান খালিদ বাসসকে বলেন, প্রবেশনকে কেবল একটি আইনি ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং সমাজ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে এটি একটি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, লঘু অপরাধে জড়িত কিছু ব্যক্তি কারাগারে গিয়ে গুরুতর অপরাধীদের সংস্পর্শে আসেন এবং একপর্যায়ে আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন। কারাগার থেকে মুক্তির পর পরিবার ও সমাজের সঙ্গে পুনরায় খাপ খাইয়ে নিতেও তাদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ তাদের সহজে গ্রহণ করতে চায় না।
আদালত সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেই ৬৬ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সাঈদ আহসান খালিদ বলেন, প্রবেশনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে কারাগারে বন্দির অতিরিক্ত চাপ কমানোর পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার ওপর চাপও হ্রাস পেতে পারে। কারাগারে না পাঠিয়ে আদালতের তত্ত্বাবধানে শর্তসাপেক্ষে সংশোধনের সুযোগ দিয়ে চট্টগ্রামে ১ হাজার ৫৫১ জন লঘু অপরাধীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে প্রবেশন ব্যবস্থা। তাদের অধিকাংশই কিশোর ও তরুণ। এ ব্যবস্থায় অপরাধীদের তাদের পরিবার ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত রেখে সংশোধনের পাশাপাশি দেশের অতিরিক্ত জনাকীর্ণ কারাগারগুলোর ওপর চাপ কমানোরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলেন, প্রবেশন ব্যবস্থার ব্যাপক প্রয়োগ সম্পর্কে অনেক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও আইনজীবীর পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় এটি এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে কারাদণ্ডকেই শাস্তির স্বাভাবিক পন্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি বলেন, কারাগার পরিচালনায় বিপুল ব্যয় হয়। অন্যদিকে, উপযুক্ত ক্ষেত্রে প্রবেশন তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল ও সমাজের জন্য অধিক কল্যাণকর বিকল্প হতে পারে। প্রবেশন ব্যবস্থার পরিধি বাড়াতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে আরও প্রবেশন কর্মকর্তা নিয়োগ, তদারকি ও নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
২০১৬ সালে চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে প্রবেশন কার্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৫১ জন অপরাধী এ সুযোগ পেয়েছেন। প্রবেশন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৯৯২ জন প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন, যা দেশের একক কোনো প্রবেশন কার্যালয়ের অধীনে সর্বোচ্চ সংখ্যা। এছাড়া শর্ত পূরণ করে ৫৫৯ জন তাদের দণ্ড থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রবেশন এমন একটি আইনি ব্যবস্থা, যেখানে আদালত কোনো অপরাধীর কারাদণ্ড স্থগিত রেখে নির্দিষ্ট শর্তে তাকে পরিবারের সঙ্গে বসবাস ও সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ দেন।
এ ব্যবস্থায় জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার একটি উদাহরণ আবদুল্লাহ (প্রকৃত নাম নয়)। ২০২৩ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তিনি। ভালো ফলাফল ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও একপর্যায়ে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন আবদুল্লাহ। পরে তৎকালীন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) তাকে গ্রেপ্তার করে এবং তাকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তবে তার জীবনের গতিপথ বদলে যায় চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এর একটি আদেশে।
চট্টগ্রাম সিএমএম আদালত ও এর অধীনস্থ আদালতগুলো সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কার্যালয়ের মাধ্যমে যোগ্য আসামি ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শর্তসাপেক্ষ তত্ত্বাবধানে রাখছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ ব্যবস্থা অপরাধীদের সমাজে পুনঃএকীভূত হতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমায় এবং লঘু অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কারাগারে গুরুতর অপরাধীদের সংস্পর্শে এসে আরও বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি হ্রাস করে। প্রবেশনপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদালতের দেওয়া শর্ত পূরণ করতে হয়।