উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
জাতীয় পার্টির অতীত ভূমিকার বিচার দেশের জনগণ ইতিমধ্যে করেছে কিন্তু এরপরও তাদের কার্যালয় ও দলটির নেতাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে একাধিকবার হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে এবং সম্প্রতি জি এম কাদেরের উত্তরার বাসায় হামলার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা এবং সব দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের এবং ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ হামলা করলে সরকার দায় এড়াতে পারে না।
ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের আটকের পর সোমবার রাতে সিপিবির নেতা-কর্মীরা একটি মিছিল বের করেন এবং পল্টন মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে স্লোগান দেওয়ার সময় যুবদল ও ছাত্রদলের পরিচয় দেওয়া ৪০-৫০ জন ব্যক্তি প্রতিবাদ করেন। দুই পক্ষের কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সিপিবির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধর করা হয় এবং হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এক বিবৃতিতে বলেন, প্রধান ফটک ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টার সময় বাধা দিলে হামলা চালানো হয় এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার পরও হামলাকারীরা দীর্ঘ সময় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন।
এর আগে যুবদলসহ বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদ কার্যালয় ঘিরে রেখে চাপ প্রয়োগ করে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপির নেতা-কর্মীদের কিছু না করে উল্টো জাসদ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দলটির নেতাদের প্রায় সবাই আত্মগোপনে চলে যান এবং ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে শেখ হাসিনার অনলাইন ভাষণ দেওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীরা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটিতে ঢুকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। ১৭ নভেম্বর বাড়িটির অবশিষ্ট অংশ ভাঙতে গেলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাধা দেয় এবং এসব ঘটনায় তৎকালীন সরকার কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
গণ-অভ্যুত্থানের পর ভিন্নমত প্রকাশের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তা সব বৈধ রাজনৈতিক দলের জন্যই নিশ্চিত করতে হবে এবং সিপিবি, জাসদ ও জাতীয় পার্টির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্নমতের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে তার পরীক্ষা। সিপিবি অভিযোগ করেছে হামলার পর পুলিশ তাঁদের দলের দুই সদস্য ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে আটক করে নিয়ে যায় এবং পরে গভীর রাতে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ঢাকায় মানববন্ধন করতে গিয়ে আটক হওয়া দীপক শীলকে পরে রাতে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
প্রায় প্রতিটি ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী সামনে থেকেছেন এবং পেছনে তাদের পক্ষ হয়ে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সহনশীল রাজনীতির কথা বললেও সিপিবিকে প্রতিপক্ষ বানানো হচ্ছে যা পল্টন ও অন্যান্য ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট। কোনো স্লোগান নিয়ে আপত্তি থাকলে প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকলেও অন্য দলের নেতা-কর্মীদের মারধর করা কিংবা কার্যালয়ের সামনে গিয়ে হুমকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয় এবং সিপিবি কেন লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে ও জাসদের কার্যালয় থেকে ২৭ জন গ্রেপ্তারের ঘটনায় সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা এখন দেখার বিষয়।
রাজনৈতিক বিরোধের সুযোগ নিয়ে একের পর এক রাজনৈতিক কার্যালয়, নেতাদের বাসভবন এবং কর্মসূচি ঘিরে মব তৈরির ঘটনা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের শূন্যতায় বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল যা এখন রাজনৈতিক সহনশীলতা, সরকারের দায়িত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা এবং সব দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব এখন সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বর্তায়।
সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করার ঘটনায় দলের নেতারা অবাধ রাজনৈতিক চর্চা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা ও বিরোধ থাকলেও সেই অভিযোগ বা রাজনৈতিক মতভিন্নতাকে কেন্দ্র করে কার্যালয়ে হামলা বা নেতা-কর্মীদের হেনস্তা করার সুযোগ নেই। সিপিবি ও জাসদের মতো দলগুলোর ওপর এমন আচরণ গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ এবং এর সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রয়োজন।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করলে রাজনৈতিক পরিবেশ আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিত করা এবং মব কালচার বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের কঠোর ও আইনসম্মত পদক্ষেপ অপরিহার্য।